ঢাকা | বঙ্গাব্দ

বদরুলের বাদরামিতে ডুবছে গণপূর্ত!

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Feb 18, 2026 ইং
বদরুলের বাদরামিতে ডুবছে গণপূর্ত! ছবির ক্যাপশন:
ad728
জয়নাল আবেদীন যশোরী ও আসাদ মাহমুদ॥  মোহাম্মদ বদরুল আলম খান। সুযোগ সন্ধানী সুবিধাভোগী ব্যক্তি হিসাবে গণপূর্ত অধিদপ্তরের আলোচিত সমালোচিত একজন তত্ত¦াবধায়ক প্রকৌশলী। বর্তমানে দখলে রেখেছেন ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১ এর গুরুত্বপূর্ণ পদ। ২১তম বিসিএস গণপূর্ত ক্যাডারের এই কর্মকর্তার চাকরির পুরোটা জীবন বিতর্কিত ও বদকর্মে ভরপুর। তার হিং¯্র শকুনি থাবায় ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন গোটা গণপূর্ত অধিদপ্তর। ডিপার্টমেন্টের নিয়োগ পোষ্টিং পদোন্নতি টেন্ডার নিয়ে তার অপ্রতিরোধ্য বাদরামিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠছেন গণপূর্ত কর্মকর্তারা। প্রধান প্রকৌশলীকে সামনে রেখে বর্তমানে তিনিই ডিপার্টমেন্টের সকল কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করছেন এমন জোড়ালো গুঞ্জন রয়েছে পূর্ত প্রকৌশলীদের মধ্যে।  অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন-অধিদপ্তরে কে বড়? প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান না গুণধর তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী বদরুল আলম খান। তথ্য সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ধূর্ত বদরুল আলমকে মানুষরুপী গীরিগিটি নামে ডাকেন সহকর্মী প্রকৌশলীরা। কারণ তিনি সুবিধা অনুযায়ী ক্ষণে ক্ষণে রং পাল্টান বা ভোল পাল্টান। কখনোবা জার্সি খুলে ওয়ারড্রবে গুছিয়ে রেখে নতুন রংয়ে নতুন জার্সি গায়ে দেন। প্রয়োজন শেষে খুলে ফেলে দেন। পরিস্থিতির পরিবর্তনে তিনি কখনো আ’লীগ কখনো জাতীয়তাবাদী বা জামায়াত আবার কখনো জুলাই যোদ্ধা। এমনকি সময়ে অসময়ে কারণে-অকারণে আত্মীয়তা পাতান ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাদের সাথে। সাবেক প্রধান প্রকৌশলী মোহাম্মদ রফিকুল ইসলামের ভাতিজা তিনি। পরবর্তীতে স্ব্রৈাচারের মন্ত্রী তোফায়েলের নাতি। ফ্যাসিবাদের আরেক মন্ত্রী র আ ম ওবায়দুল মোক্তাদীর চৌধুরীর ভাগিনা তিনি। বর্তমান গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের বড় কুটুম। বর্তমান প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামানের অত্যন্ত কাছের লোক। প্রধান প্রকৌশলীকে এই পদে তিনিই বসিয়েছেন বলে সহকর্মী প্রকৌশলীদের কাছে দম্ভ করে বলে থাকেন। তিনি যা বলেন সচিব তাই করেন বলে- প্রকৌশলী বদরুল আলম নিজে নিজে অহংকার বোধ করেন।
আরো জানা যায়, গত ৩ ফেব্রুয়ারী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রশাসন শাখা -৭ থেকে জারিকৃত এক প্রঞ্জাপনে তাকে ঢাকা গণপূর্ত-১ নং সার্কেলে বদলী করা হয়। কিন্তু এই সার্কেলে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (কুমিল্লা) ওসমান গনিকে সুপারিশ করেছিলেন সচিব নজরুল ইসলাম। বিষয়টি গোপণ মাধ্যমে জানতে পেরে সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহেরকে প্রায় অর্ধকোটি টাকা ঘুষ দিয়ে তাকে দিয়ে গৃহায়ন ও গণপূর্ত উপদেষ্টাকে ম্যানেজ করে সচিবকে ফোন করান বদরুল। এর ফলে জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে এমন একটি বদলী আদেশ হয়। এ নিয়ে তোলপাড় হয় গোটা গণপূর্ত অধিদপ্তর। উপহাড় স্বরূপ তাহেরের নির্বাচনী খরচ বাবদ গত ১০ ফেব্রুয়ারী রাতে গাড়ি ভর্তি করে ১কোটি টাকা পাঠান প্রকৌশলী বদরুƒল। পূর্ত ভবন থেকে সাভার সার্কেলের লাল গাড়িতে করে ওই দিন সন্ধার পরে টাকা পাঠিয়ে দেওয়া হয় তাহেরের বাসায়। প্রকৌশলী বদরুল মনে করেছিলেন জামায়াত নির্বাচনে জয়ী হয়ে সরকার গঠন করবে। কিন্তু ১২ ফেব্রুয়ারী নির্বাচনের পরে পরিস্থিতি পাল্টে গেলে প্রকৌশলী বদরুল আলম মির্জা আব্বাসের বাসায় গিয়ে দেখা করেন তিনি (আব্বাস) পূর্ত মন্ত্রী হচ্ছেন এমন ভেবে। এখন তিনি নিজ সিন্ডিকেটের লোকজন নিয়ে বর্তমান পূর্ত মন্ত্রীকে ম্যানেজ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছেন।       
গত ডিসেম্বরে দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা দেওয়া এক অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, স্বৈরাচারের প্রেতাত্ম¦া সাবেক ছাত্রলীগ নেতা প্রকৌশলী বদরুল আলম খান ২০০৩ সালে সহকারী প্রকৌশলী হিসাবে গণপূর্ত অধিদপ্তরে যোগদান করেন। এরপর পদোন্নতি পেয়ে সাবডিভিশনাল ইঞ্জিনিয়ার (এসডিই) হয়েই ঠিকাদারি-বদলি বাণিজ্যসহ বিভিন্ন প্রকল্পের কাজে কমিশন বাণিজ্যের মাধ্যমে রাতারাতি নামে-বেনামে শত কোটি টাকার মালিক বনে যান তিনি। চাকরির বিভিন্ন পর্যায়ে এভাবে লুটপাটের সাম্রাজ্য কায়েম করে অর্জন করা অবৈধ সম্পদের মধ্যে রয়েছে- তার স্ত্রীর নামে ঢাকার মালিবাগে গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, খিলগাঁওয়ের গোড়ানে ৬তলা বিলাশবহুল বাড়ি, আশুলিয়ায় গার্মেন্টস্ এক্সেসরিজ কারখানা, আপন ভাইয়ের সাথে যৌথভাবে রিয়েল এস্টেট ব্যবসা, নামে-বেনামে বিভিন্ন লাইসেন্সের মাধ্যমে পরোক্ষ ঠিকাদারী ব্যবসা, স্ত্রী ও ভাই-ভাতিজা শালা-শালির নামে থাকা বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবে প্রায় ২০ কোটি টাকার এফডিআর, রাজধানীর গুলশানে নিজ নামে একটি ও স্ত্রীর নামে দু’টি বিলাসবহুল আবাসিক ফ্ল্যাটের মালিকানা, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ১০ কাঠার তিনটি প্লটসহ বিভিন্ন দেশে হরেক রকম বিনিয়োগ। 
অপরদিকে, নির্বাহী প্রকৌশলী পদে বদরুল আলমের প্রথম পোষ্টিং হবিগঞ্জে। সেখানে পাসপোর্ট ভবন নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প নিয়ে ব্যাপক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন তিনি। ওই সময়ে তার অনিয়ম দুর্নীতি নিয়ে একাধিক জাতীয় পত্রিকায় তথ্যবহুল সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরে  স্বৈরাচার সরকারের ২য় টার্মে সাবেক ছাত্রলীগ নেতা পরিচয়ে তিনি ২০১৪ সালে তৎকালীন মন্ত্রী তোফায়েল আহমেদের কাছে তদবির করিয়ে ভোলায় লোভনীয় পোস্টিং বাগিয়ে নেন। সেখানে ২০১৪ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ৫বছরের চাকরি জীবনে তিনি তোফায়েল আহমেদের ভাতিজা এমপি মইনুল হোসেন বিপ্লব, এমপি আলী আজম মুকুল ও নুরুন্নবী শাওন এমপির সাথে জোটবদ্ধ হয়ে লুটেরা সিন্ডিকেট গঠন করে সিজিএম আদালত ভবন, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতাল, পুলিশ বিভাগের নতুন থানা নির্মাণ, জেলা ও উপজেলা টিটিসি, উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি অফিস, সাব-রেজিস্ট্রি অফিস নির্মাণসহ বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের সকল দরপত্র নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে পছন্দের ঠিকাদারকে কাজ পাইয়ে দিয়ে কমিশন বাণিজ্যে কয়েক কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এছাড়াও তিনি ভোলা গণপূর্ত বিভাগের মেরামত রক্ষনাবেক্ষণ কাজ থেকে ১৫ শতাংশ হারে ঘুষ আদায় করেও বড় অংকের অর্থ লোপাট করেন। 
পরবর্তীতে তিনি সাবেক মন্ত্রী ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীর মাধ্যমে ্বড় অংকের অর্থের বিনিময়ে ২০২০ সালে প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদের কাছে তদবির করে ময়মনসিংহে পোস্টিং করিয়ে নেন। একই ধারাবাহিকতায় সেখানেও ব্যাপক দুর্নীতি ও লুটপাটের দায়ে মন্ত্রণালয়ের নিদের্শে তাকে ওএসডি করা হয়। ময়মনসিংহ অবস্থানকালে তিনি সরকারি নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে লাখ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে ময়মনসিংহ শহরে বিধি বহির্ভূতভাবে অসংখ্য বহুতল ভবনের নকশা অনুমোদন করেন। এই নকশা/প্ল্যান পাশের খাত থেকেও তিনি প্রায় ২কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেন। অবৈধ অর্থের জোড়ে পরবর্তীতে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি বাগিয়ে নিয়ে চট্টগ্রাম ১নং গণপূর্ত সার্কেলে থাকালীন সরকারী কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জন্য বহুতল আবাসিক ভবন নির্মাণ প্রকল্পে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে আরো কয়েক কোটি টাকা লোপাট করেন। মাঝে অল্পকিছু দিনের জন্য কুমিল্লা সার্কেলের দায়িত্বে থেকে দুর্নীতি আল লুটপাটের ষোলকলা পূর্ণ করেন এই লুটেরা প্রকৌশলী। ২০২৪ সালে ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরী গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রী হলে দুর্নীতিবাজ বদরুল আলম খান মন্ত্রীর রাজনৈতিক এপিএস মুসা আনসারীকে কোটি টাকা ঘুষ দিয়ে ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-১ বা ২ অথবা ঢাকা গণপূর্ত সার্কেল-৩-এর যে কোন একটিতে পদায়নের জন্য গণপূর্ত অধিদপ্তরের তৎকালীন প্রধান প্রকৌশলীর ওপর তুমুল চাপ সৃষ্টি করেন। ওবায়দুল মুক্তাদির চৌধুরীর অব্যাহত চাপের মুখে বদরুলকে ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ কোন সার্কেলে পদায়ন করা হবে মর্মে ওই সময়ে প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতার সাবেক ওই মন্ত্রীকে আশ্বস্থ করেন।
আরও জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ই আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের পর বদরুল ইতোপূর্বে সাবেক মন্ত্রীর চাপ সত্ত্বেও পোস্টিং না পাওয়ায় ক্ষুব্ধ হয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলীর দরজায় লাথি মারাসহ ঔদ্ধত্য আচরণ করে পূর্ব প্রতিশ্রতি অনুযায়ী পোস্টিং দাবী করেন। তার চাপে পড়ে প্রধান প্রকৌশলী অসহায় হয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের গুরুত্ত্বপূর্ণ সাভার সার্কেলে তাকে পদায়ন করেন বদের হাড্ডি বদরুলকে। সার্কেলের অধীন এই চারটি গণপূর্ত বিভাগে সরকারের আবাসন প্রকল্প ও অন্যান্য গুরুত্ত্বপূর্ণ নির্মাণ কাজ চলমান ছিলো সে সময়ে। ওই সকল কাজে কারিগরী অনিয়ম কারসাজির আশ্রয় নেয়ার পাশাপাশি এপিপির কাজগুলোতে শতকরা ৮০ ভাগ কাজ এলটিএম পদ্ধতিতে ও শতকরা ২০ ভাগ কাজ ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বান করতে মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও তিনি নিজের সার্কেলের আওতায় শতকরা ৮০ভাগ নির্মাণ কাজ ১৫% টাকার বিনিময়ে ওটিএম পদ্ধতিতে দরপত্র আহ্বানের মাধ্যমে বিক্রি করেছেন। 
একইসাথে সাভার সার্কেলে থাকতে জনৈক আসিফ নামক এক ঠিকাদারকে দিয়ে মিরপুর ডিভিশনের ভাষানটেক থানার কাজ পাইয়ে দেওয়াসহ সাভার মানিকগঞ্জ ও গাজীপুরে নির্বাহী প্রকৌশলীদেরকে ফোন করে অসংখ্য কাজ পাইয়ে দেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক মিরপুরের ‘আ’ অদ্যক্ষরের আরেক ঠিকাদার বলেন, ওই ঠিকাদার অসিফের সাথে গোপণ পার্টনারশীপের ব্যবসা রয়েছে প্রকৌশলী বদরুলের। এছাড়াও বদরুল সিন্ডিকেটে আরো আছে কথিত প্রফেসর মনির, ভোলার পলাশ, হাসান, বি-বাড়িয়ার জনৈক সোরাব সহ আরো ২/৩জন। এই সিন্ডিকেটকে গত দেড় বছরে সাভার সার্কেলের ৪টি ডিভিশনে প্রায় ২শ’ কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দিয়েছেন তিনি। তারা গত ২বছর যাবৎ বদরুলের সহযোগীতায় দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গোটা গণপূর্ত অধিদপ্তর। এছাড়াও প্রকৌশলী বদরুলের বিরুদ্ধে রয়েছে বিভিন্ন ধরণের অসামাজিক কর্মকান্ডের অভিযোগ।  
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য এই প্রতিবেদক গত তিন দিনে প্রকৌশলী বদরুলের অফিস ও মোবাইলে কয়েক দফা যোগাযোগ করেও না পাওয়ায় তার মতামত নেওয়া সম্ভব হয়নি। (ক্রমশঃ)




শেয়ার করুন:
কমেন্ট বক্স
নারী কেলেঙ্কারীতে অপ্রতিরোধ্য গণপূর্ত প্রকৌশলী কামরুল!

নারী কেলেঙ্কারীতে অপ্রতিরোধ্য গণপূর্ত প্রকৌশলী কামরুল!