নিজস্ব প্রতিবেদক॥ ঘুষ-দুর্নীতি আর স্বৈরাচারের আখড়ায় পরিণত হয়েছে নারায়ণগঞ্জ স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর-এলজিইডি। ফ্যাসিবাদের দোসর প্রকৌশলীদেরকে ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে শতকরা হিসেব করে ঘুষ দিতে বাধ্য হন ঠিকাদাররা। এখানে মোটা অংকের ঘুষ ছাড়া মেলেনা সেবা টাকা ছাড়া নড়ে না ফাইল। এই দপ্তরের বাস্তবায়িত বিভিন্ন উন্নয়ন কাজের গুণগত মান যাচাই-বাছাই নিয়েও বর্তমানে চরম সংশয় ও অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। তবে ঘুষ দুর্নীতি আর কমিশন বাণিজ্যের নগদ বান্ডিলে স্বৈরাচারের দোসর নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান আছেন খোশমেজাজে, বহালতবিয়তে। প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান দম্ভের সাথেই ঠিকাদারদের বলে থাকেন, প্রকল্প পরিচালক (পিডি), এসও এবং আমার ফাইভ পার্সেন্ট বুঝিয়ে না দিলে এখানে কোনো ঠিকাদারের কাজ করার দরকার নেই। তিনি মাঝে মাঝেই আরো বলে থাকেন, আমার অফিসের সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী এবং বড়বাবুকেও (হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা) ঠিকাদারদের উচিৎ যথাযথ খুশি রাখা। তিনি ঠাট্টার ছলে প্রকাশ্যেই বলে থাকেন, বড়বাবুদেরকেতো আমি গ্রাম থেকে বাবার জমি বিক্রি করে খুশি করতে যাবো না।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন ভুক্তভোগী ঠিকাদার বলেন, ‘কাজ, ওয়ার্কঅর্ডার, কাজ তদারকি কর্মকর্তা, বিল পাওয়ার আগে হিসাবরক্ষকসহ অফিস সহকারী, উপসহকারী প্রকৌশলী, সহকারী প্রকৌশলী, সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী এমনকি প্রকল্প পরিচালকসহ জনে জনে লাখ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়।’
২০২৪ আগস্ট বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন দমানোর অন্যতম ক্যারিশম্যাটিক কার্যলয়ে পরিণত হওয়া নারায়ণগঞ্জ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান বেপরোয়া অনিয়ম চরম দুর্নীতি আর আওয়ামী পূণঃ বাসনে এখনো স্বমহিমায় উদ্ভাসিত। ছাত্র জনতার এই আন্দোলন নস্যাৎ করতে এলজিইডি ভবনে নিজ কক্ষে মধ্যরাত পর্যন্ত ছাত্রলীগ আর যুবলীগ নেতাদের সাথে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত থাকতেন আহসানুজ্জামান। এখনো তাদেরকে নামে-বেনামে কাজ পাইয়ে দিয়ে আর্থিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করাসহ তার সকল অপকর্মে সঙ্গ দিয়ে আসছেন সিনিয়র সহকারী প্রকৌশলী ও হিসাবরক্ষক।
সে সময়ে এই অফিস থেকেই নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান প্রতিদিন ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমাতে জেলা যুবলীগ ও ছাত্রলীগ ক্যাডারদের জন্য শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে পাঠাতেন লক্ষ লক্ষ টাকা।
স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা দিল্লি পালালেও নারায়ণগঞ্জ এলজিইডি’র নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামানের মতো তার দোসররা এখনও দেশের বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে ঘাপটি মেরে বসে রয়েছেন। তারা সুযোগ বুঝে লক্ষ্য অর্জনে ছলে বলে কৌশলে এমনকি বিগত সময়ের বিপুল পরিমাণ উপার্জিত অর্থ দিয়ে টার্গেট পূরণেও সক্ষম হচ্ছেন। শেখ হাসিনা পালালেও নারায়ণগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামানের মতো হাসিনার অনেক পেতাত্মা রয়েছেন এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে।
২০২৪-২৫ আর্থবছরে কদমরসুল সেতুর টেন্ডারে গোপণ রেটকোড ফাঁসের মাধ্যমে হাতিয়ে নিয়েছেন প্রায় দশ কোটি টাকা। এই সেতুর নকশা কয়েকদফা সংশোধন ও জালিয়াতির মাধ্যমেও আরো ১০ কোটি টাকার ঘুষ বাণিজ্য করেন প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান। ইতোমধ্যে অবৈধ অর্থের জোরে সবাইকে ম্যানেজ করে ফেলেছেন তিনি। এলজিইডিতে বিগত আওয়ামী আমলে যারা আ’লীগের নাম ব্যবহার করে কর্মস্থলে রামরাজত্ব কায়েম করেছেন এই আহসানুজ্জামান তাদেও মধ্যে অন্যতম একজন। তারা বিগত সময়ে অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুট করে বিত্তশালী হয়েছেন। এখন তারাই সেই অর্থ দিয়ে দুর্নীতিবাজদের ম্যানেজ করে ফেলছেন। অন্যদিকে দুর্নীতিবাজরা রাতারাতি ভোল পাল্টিয়েও জাীয়তাবাদের লেবাস গায়ে লাগিয়ে বিদেশে অর্থ পাচার এবং কানাডার টরেন্টোর বেগম পাড়াতেও বাড়ি বানিয়েছেন বলে অফিস স্টাফদের মধ্যে জনশ্রুতি আছে।
আরো জানা যায়, বহুল আলোচিত ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরশাসক শেখ হাসিনা সরকারের বিশ্বস্থ সহচর ও সাবেক ছাত্রলীগ ক্যাডার নারায়ণগঞ্জ এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামানের নগ্ন হস্তক্ষেপে এলজিইডিতে হাজার কোটি টাকার ভয়াবহ লুটপাট তন্ত্র কায়েম করা হয়েছে। অবৈধ অর্থের জোড়ে প্রকৌশলী আহসানুজ্জামানদের ক্ষমতার হাত এতোটাই লম্বা ছিলো যে, এলজিইডির কোন প্রধান প্রকৌশলী নারায়ণগঞ্জে সরকারি অর্থ রক্ষায় কার্যকর কোন ভূমিকা রাখতে পারেননি। আহসাজ্জামানের প্রিয়জন হিসাবে পরিচিত জেলা যুবলীগের কতিপয় ঠিকাদার নেতা শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাহী প্রকৌশলীর মাধ্যমে বাগিয়ে নিয়েছেন হাজার কোটি টাকার কাজ। বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন শুরুর কিছুদিন আগেও গোপণে সিডিউল রেট ফাঁস করে ৫০কোটি টাকা নগদ গ্রহণ করে তার পছন্দের ঠিকাদারকে পাইয়ে দেন হাজার কোটি টাকার কাজ। এছাড়া তার কমিশন বাণিজ্যে ইনভলড্ ঠিকাদারদের দিয়েছেন শত-শত কোটি টাকার কাজ।
আহসানুজ্জামানের এসব অন্যায় কাজের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার সাহস ছিল না কারোরই। দেশের ৬৪ জেলার শেখ হাসিনার আস্থাভাজন শীর্ষ কর্মকর্তাদের অন্যত্র বদলি এবং কেউ কেউ ওএসডি হলেও নারায়ণগঞ্জ এলজিইডির বিলিয়নিয়ার নির্বাহী প্রকৌশলী আহসানুজ্জামান এবং তার সকল অপকর্মের রাজস্বাক্ষি ওই অফিসের সহকারী প্রকৌশলী এখনও রয়েছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
তাই দুর্নীতিবাজ নির্বাহী প্রকৌশলী ও তার সহযোগীদের গ্রেপ্তারপূর্বক আইনের আওতায় এনে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা প্রয়োজন বলে সচেতনমহল মনে করেন।
দীর্ঘদিন যাবৎ সিডিউলের তথ্য ফাঁস, লটারীর নামে নাটক, কমিশন বাণিজ্যে ঠিকাদারদের ১৫/২০ জনের ভাগ্য খুলতে সহায়তা করে নিজেও হয়েছেন শত কোটি টাকার মালিক।